- Advertisement -

সবজির চারা উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক কলাকৌশল

সবজির চারা উৎপাদন

3,973

- Advertisement -

 

সবজির চারা উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক কলাকৌশল
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

সবজি অত্যন্ত রুচিশীল, সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার। “সুস্থ সুন্দর দেহমন, হাসিখুশি সারাক্ষন” থাকতে হলে খাবার টেবিলে সবজির বিকল্প নেই। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রায় ২৫০ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। খাদ্য উপাদানের প্রত্যেকটি উপাদান বিভিন্ন সবজির মধ্যে কমবেশি বিদ্যমান। অর্থনৈতিকভাবেও সবজি উৎপাদন খুবই লাভজনক। বাংলাদেশে প্রায় ৮৯ ধরনের শাকসবজি চাষ করা হয়। সবজির ভাল উৎপাদন অনেকাংশে গুণগত মানের চারার উপর নির্ভরশীল। তাই সবজির চারা উৎপাদনের সময় বিশেষ প্রযুক্তি ও কলা কৌশল অনুসরণ করতে হয়। আমাদের দেশে সাধারণত টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, লাউ, বাঁধাকপি, মরিচ, পেঁয়াজ এসব সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে আগাম শীতকালীন ও রবি মৌসুমের সবজি চাষের জন্য সবজি চারা উৎপাদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। উৎকৃষ্ট মানের সবজিরর চারা উৎপাদনের জন্য প্রচুর দক্ষতা এবং বিশেষ কিছু প্রযুক্তি বিবেচনা করা উচিত।

সবজির বীজ
বিশ্বস্থ ও প্রকৃত বীজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাহিদা মাফিক সঠিক জাতের সবজি বীজ ক্রয় করতে হবে। জাত নির্বাচন ও বীজ ক্রয়ের ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। বীজের প্যাকেটের গায়ে বীজের গুণগত মানের কতগুলো তথ্যাদিসহ উক্ত বীজের মেয়াদ স্পষ্ট করে লেখা আছে এমন বীজের প্যাকেট কিনতে হবে। হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখবেন চকচকে রং বেরং এর প্যাকেট মানেই গুণগত মানের বীজের নিশ্চয়তা দেয় না।

বীজতলার স্থান নির্বাচন
সবজির চারা উৎপাদনের জন্য সঠিক স্থানে বীজতলা তৈরি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বীজতলাকে শিশু চারার বিছানা বলা হয়ে থাকে। নরম, তুলতুলে, পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন ও রোগ জীবাণুমুক্ত বীজতলা সবজি চারা উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই বীজতলা তৈরির স্থান নির্বাচনের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন- অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি, যেখানে বৃষ্টি বা বন্যার পানি জমে না এবং সহজে নিষ্কাশন করা যায়। ছায়াবিহীন, পরিষ্কার এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের উপযোগী স্থানে বীজতলা করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, বীজতলার কাছাকাছি যেন পানির উৎস থাকে এবং বাড়ি, খামার বা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হলে অফিসের কাছাকাছি হওয়া উচিত। বীজতলার মাটি বেলে দোঁআশ বা দোঁআশ এবং অবশ্যই উর্বর হতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করতে হলে বীজতলা যতদূর সম্ভব ক্রেতাদের কাছাকাছি এবং ভাল যোগাযোগ সম্পন্ন স্থানে স্থাপন করতে হবে।

বীজতলা তৈরী
একক বীজতলা বা হাপোর সাধারণত এক মিটার চওড়া ও তিন মিটার লম্বা হবে। প্রয়োজনে বড় জমিকে ভাগ করে একাধিক বীজতলা তৈরি করা যায়। পাশাপাশি দুটি বীজতলার মধ্যে কমপক্ষে ৬০ সেমি ফাঁকা রাখতে হবে। বীজ বপনের কয়েকদিন আগে বীজতলার মাটি ২০-২৫ সেমি গভীর করে ঝুরঝুরা ও ঢেলা মুক্ত করে তৈরি করতে হবে। বীজতলা সাধারণত ১০-১৫ সেমি উঁচু করে তৈরি করতে হবে। মাটি, বালি ও পঁচা গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেয়াই ভালো। উর্বরতা কম হলে প্রতি হাপোরে ১০০ গ্রাম টিএসপি সার বীজ বপনের অন্তত এক সপ্তাহ আগে ছিটিয়ে দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশাতে হবে। বাণিজ্যিক ভাবে চারা উৎপাদন করতে চাইলে ইট সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ী বীজতলা তৈরি করাই শ্রেয়।

বীজতলার মাটি শোধন
বীজ বপনের পূর্বে বীজতলার মাটি বিভিন্ন পদ্ধতিতে শোধন করা যায়। এতে অনেক মাটিবাহিত রোগ, পোকামাকড়, আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়। যেমন- সৌরতাপ ব্যবহার করে, জলীয় বাষ্প ব্যবহার করে, ধোঁয়া ব্যবহার করে, রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে, খড় বা কাঠের গুড়া পুড়িয়ে, পোল্ট্রি রিফিউজ ব্যবহার করে।
সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতি হলো সৌরতাপ ব্যবহার করে বীজতলার মাটি শোধন করা। এক্ষেত্রে বীজ বপনের ১২-১৫ দিন পূর্বে বীজতলার মাটি যথাযথ ভাবে তৈরি করে ভালভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। তারপর স্বচ্ছ অথবা রঙ্গিন পলিথিন দিয়ে বায়ু নিরোধক করে ঢেকে রাখতে হবে। এতে সারাদিনের সূর্যালোকে পলিথিনের ভিতরে বীজতলার মাটির তাপমাত্রা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় ও অনেকাংশে মাটিবাহিত রোগজীবাণু দমন করবে। এছাড়াও অনেক ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও আগাছা দমন হয়। বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারী সবজি চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে বীজতলায় রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ফরমালডিহাইড পানিতে মিশিয়ে (৫০:১) ব্যবহার করা হয়। পোল্ট্রি রিফিউজ ব্যবহার করেও বীজতলায় মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধির সাথে সাথে বীজতলার মাটি শোধন করা যায়। তাছাড়া খড় বা কাঠের গুড়া পুড়িয়েও বীজতলার মাটি সহজেই শোধন করা যায়।

বীজ শোধন
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী ব্যবস্থাপনা হলো বীজ শোধন। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। তাই বীজশোধন ইদানিং প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম হাতিয়ার। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অলংকার। বীজতলায় বীজ বপনের পূর্বে সবজি বীজ নানা পদ্ধতিতে শোধন করা যায়।
ক্স রাসায়নিক ঔষধ দ্বারা বীজ শোধন পদ্ধতি বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত ও কম ঝামেলাপূর্ণ। কার্বেন্ডাজিম, কার্বোক্সিন, থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক বীজ শোধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। বীজ শোধনের ফলে বিভিন্ন সবজির এনথ্রাকনোজ, লিফস্পট, ব্লাইট ইত্যাদি রোগ ও বপন পরবর্তী সংক্রমন রোধ সম্ভব হয়।
ক্স জৈব বালাইনাশক হিসেবে কালোজাম পাতার রস, নিম, নিশিন্দা, বিষকাটালী, রসুন এসবের রস বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার করা যায়।

বীজ পরীক্ষাকরণ
কথায় আছে, ভাল বীজে ভাল ফসল। গুণগত বীজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উচ্চ অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা। শাক সবজির বীজ বপনের পূর্বে ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেয়া প্রয়োজন। ভাল ও বিশুদ্ধ বীজের অভাবে, উন্নত জাতের সবজিতেও উচ্চ ফলন পাওয়া যায় না। বীজের উৎকৃষ্টতা নির্ভর করে তার অঙ্কুরোদগম ক্ষমতার উপর।
ক্স অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা দেখার জন্য পেট্রিডিশ বা ছোট থালা নিয়ে তার উপর ঐ মাপের চোষক কাগজ ও পানি দিয়ে ভিজিয়ে ৫০-১০০টি বীজ কয়েকদিন রেখে অঙ্কুরোদগমের শতকরা হার বের করে নিতে হবে। সাধারণত শতকরা আশি ভাগ চারা গজালে সেগুলো ভাল বীজ বলে ধরা হয়।

বীজ বপন
বীজতলায় সারি বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা যায়, তবে সারিতে বপন করা উত্তম। সারিতে বপনের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট দূরত্বে (৪ সেমি) কাঠি দিয়ে ক্ষুদ্র নালা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। শুকনা মাটিতে বীজ বপন করে সেচ দেয়া উচিত নয়, এতে মাটিতে চটা বেঁধে চারা গজাতে ও বাতাস চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সেচ দেয়া মাটির জো অবস্থা এলে বীজ বপন করতে হয়। যে সমস্ত বীজের আবরণ শক্ত, সহজে পানি প্রবেশ করে না, সেগুলোকে সাধারণত বোনার পূর্বে পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘন্টা অথবা শতকরা এক ভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে এক রাত্রি ভিজিয়ে বপন করতে হয় (যেমন লাউ, চিচিংগা, মিষ্টি কুমড়া, করলা, উচ্ছে ও ঝিংগা ইত্যাদি)।

চারা উৎপাদনের বিকল্প পদ্ধতি
সাধারণত প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিশেষ করে বন্যার সময় বীজতলায় চারা উৎপাদনের জন্য বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে সবজির চারা কাঠের বা প্লাস্টিকের ট্রে, পলিথিনের ব্যাগে, মাটির টবে, গামলায়, থালায়, কলার খোলে উৎপাদন করা যায়। ছোট আকারের পলিথিনের ব্যাগে বা অন্যান্য মাধ্যমে এদের চারা উৎপাদন করলে সহজে শেকড় ও মাটিসহ চারা রোপণ করা যায়।

বীজতলায় আচ্ছাদন ও মশারী
বৃষ্টির পানি ও অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে বীজতলাকে রক্ষা করার জন্য আচ্ছাদন করা যায়। কম খরচে বাঁশের ফালি করে বীজতলায় প্রস্থ বরাবর ৫০ সেমি পরপর পুতে নৌকার ছৈ এর আকার তৈরি করে, বৃষ্টির সময় পলিথিন দিয়ে এবং প্রখর রোদে চাটাই দিয়ে বীজতলার চারা রক্ষা করা যায়। সাধারণত সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণের জন্য বীজতলায় আচ্ছাদনের পাশাপাশি মশারীর ব্যবস্থা করলে খুব ভালো হয়।

চারার যত্ন
যতনে রতন মিলে। চারা গজানোর পর হালকা ছায়া, পরিকল্পিতভাবে পানি সেচ, চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর দ্বিতীয় বীজতলায় সারি করে রোপন এসব করলে ভালোমানের চারা তৈরি হয়।

দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ
জমিতে চারা লাগানোর পূর্বে মূল বীজতলা থেকে তুলে দ্বিতীয় বীজতলায় সবজি চারা রোপনের পদ্ধতিকে সবজির চারার দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ পদ্ধতি বলে। সাধারণত ১০-১২দিনের চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তরিত করা হলে কপি গোত্রের সবজি, বেগুন ও টমেটো চারা শিকড় বি¯ৃ‘ত ও শক্ত হয়, চারা অধিক সবল ও তেজী হয়। চারা লাগানোর পর হালকা পানি দিতে হবে এবং বৃষ্টির পানি ও প্রখর রোদ থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন বা চাটাই দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

বীজতলায় চারার রোগ দমন
বীজতলায় বপনকৃত বীজ গজানোর পূর্বে এবং পরে রোগাক্রান্ত হতে পারে। তাই আগেই বীজতলার মাটি কাঠের গুড়া পুড়িয়ে, সৌরতাপ, পোল্ট্রি রিফিউজ ও খৈল ব্যবহার করে শোধন করে নিতে হবে। বীজতলার মাটি সুনিষ্কাশিত রাখা রোগ দমনের প্রধান উপায়। প্রতিষেধক হিসেবে মাটিতে কপার অক্সি ক্লোরাইড দুই গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে বীজতলার মাটি ভাল করে ভিজিয়ে কয়েকদিন পর বীজ বপন করতে হবে।

——-

- Advertisement -

3 মন্তব্য
  1. মো: মেহেদী হাসান বলেছেন

    খুব ভাল লেখা কিন্তু কপি বা ডাওনলোড হয় না।

  2. MORTTOJA HOSSAIN MOLLA বলেছেন

    Thank you for your kind information
    Thank you so much

  3. MORTTOJA HOSSAIN MOLLA বলেছেন

    Thank you for your kind information

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.