- Advertisement -
পতিত জমিতে শাকসবজি চাষ
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
পুষ্টি ও গুণগতমানের খাবারের জন্য শাকসবজির বিকল্প নেই। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ২০০-২৫০ গ্রাম শাকসবজি খাওয়া দরকার। উন্নত দেশগুলোর মানুষের খাদ্যে তিনের দু’ভাগই থাকে সবজি আর আমাদের খাদ্যে পাঁচের এক ভাগ মাত্র সবজি। শরীরে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের অন্যতম উৎস শাকসবজি। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আমাদের গড় আয়ু কম হওয়ার অন্যতম কারণও হচ্ছে শাকসবজি কম খাওয়া। তাই নিয়মিত সবজি খাওয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রতিদিন বেশি পরিমাণে টাটকা শাকসবজি খেতে চাইলে তা আবাদ করে খাওয়াই ভালো। আমাদের বাড়ির আশেপাশে ও আঙ্গিনায়, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে ও জমির আইলে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা ছোট ছোট জায়গাগুলোতে উপযুক্ত সবজি বেছে নিয়ে খুব সহজেই চাষ করা যায়। এছাড়া বড় গাছে, ঘরের চালে, বাড়ির ছাদে ও বারান্দায় চাষ করা যায় বেশ কিছু সবজি। সর্বোপরি পতিত জমি বা খালি পড়ে থাকা জমিতে শাকসবজি চাষের বিকল্প নেই। এতে নিজেদের পারিবারিক চাহিদাও মিটবে। আত্নীয় স্বজনকেও দেওয়া যায়। সম্ভব হলে বিক্রিও করা যায়। এছাড়াও বাজারে সবজির মূল্য যেভাবে বৃদ্ধি তাতে সংসারের একটু হলেও সাশ্রয় হবে।
অব্যবহৃত এসব জায়গায় সবজি চাষ করতে হলে প্রথমেই জায়গার ধরন অনুযায়ী সবজি নির্বাচন করতে হবে। বাড়ির আশপাশে ও উঠানের ফাঁকা জায়গাগুলোর মধ্যে সূর্যের আলো পড়ে এমন জায়গায় বেগুন, টমেটো, কপি, ডাঁটা, শালগম, গাজর ঢেঁড়স এসব শাকসবজি চাষ করা যায়। এ ছাড়াও লালশাক, পুঁইশাক, ধনিয়া, পুদিনা, লেটুস, বথুয়াশাক, মটরশুুঁট এসব চাষ করা যায়। যেসব জায়গায় জাংলা বা মাচা তৈরি করে দেয়ার ব্যবস্থা আছে সেখানে এবং ঘরের চালে, বাড়ির ও জমির ঘেরা-বেড়ার সাথে লতানো সবজি যেমন- লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, শসা, শিম, চিচিংগা, বরবটি করলা, কাঁকরোল, পটল এসব সবজির চাষ করা যায়। বাড়িতে ঢুকার রাস্তার পাশে ও উঠানের পাশে সজিনা, কাঁচকলা, পেঁপে এসব দীর্ঘমেয়াদি সবজির গাছ লাগানো যায়। বাড়ির আশপাশের ফলগাছ ছাড়া অন্যান্য বড় গাছের গোড়ায় লতানো জাতীয় সবজি যেমন- ঝিঙা, শিম, ধুন্দুল, গাছ আলু এসব লাগানো যায়।
পুকুর পাড়ে ও রাস্তার ধারে পরিকল্পিতভাবে সবজি চাষ করতে পারলে এসব জায়গা থেকেও অনেক লাভবান হওয়া যায়। এসব জায়গায় লতানো জাতীয় সবজি, পেঁপে, সজিনা খুব সহজেই উৎপাদন করা যায়। কিছু দুর পর পর মাদা তৈরি করে মাটির সাথে পর্যাপ্ত জৈবসার মিশিয়ে বীজ বপন করে পরে চারা বড় হলে জাংলা বা মাচা তৈরি করে দিয়ে এসব জায়গায় লতানো জাতীয় সবজি আবাদ করা যায়। পুকুর পাড়ে ও রাস্তার ধারে পেঁপে ও সজিনার চাষ করলে অল্প পরিচর্যাতেই দীর্ঘদিন এসব গাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করা যায়। কারণ সূর্যের আলো, মাটির রস এবং উর্বরতা এসব জায়গায় বেশি থাকে বলে গাছের গুণাগুণও ভালো থাকে।
জমির আইলে সবজি চাষে ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং ফসলে অনেক পোকার আক্রমণ কম হয় এবং অনেক উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ হয়। বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, ডাঁটা, মটরশুঁটি, ফরাসি শিম, স্কোয়াশ এসব সবজি এবং লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক জমির আইলে চাষ করা যায়। জমির আইলে কিছু দূর পর পর মাদা তৈরি করে আইলের লতানো জাতীয় সবজি চাষ করা যায়। আইলের পাশে জমির ওপর উঁচু করে জাংলা তৈরি করে দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। জমির আইলে এসব সবজি চাষের জন্য আইলের মাটি কুপিয়ে পর্যাপ্ত জৈবসার দিয়ে বীজ বপন বা চারা রোপণ করতে হবে। আইলে সবজি চাষের জন্য শীতকালই বেশি উপযোগী।
শহরাঞ্চলে বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় বেশ কিছু সবজি চাষ করা যায়। ছাদে মাটি ফেলে এবং ছাদে ও বারান্দায় টব, ঢাকনাবিহীন কাঠের বাক্স, কাটা ড্রাম, বালতি স্থাপন করে তাতে মাটি ভরাট করে বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সবুজ ফুলকপি, মরিচ উৎপাদন করা যায়। ছাদে মাচা তৈরি করে দেয়ার সুযোগ থাকলে লতানো জাতীয় সবজিও চাষ করা যায়। এ ক্ষেত্রে ছাদের বা টবের মাটির সাথে পর্যাপ্ত জৈবসার মিশিয়ে নিতে হবে। সবজি গাছ যেন ঠিকমতো সূর্যের আলো পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অব্যবহৃত এসব জায়গায় শাকসবজি চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার জন্য মৌসুম অনুযায়ী এবং জায়গার ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত শাকসবজি এবং এগুলোর উপযুক্ত জাত নির্বাচন করে সঠিক সময়ে ও সঠিক পদ্ধতিতে বীজ বপন ও চারা রোপণ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ চারার বদলে দেয়া, চারা বড় হলে প্রয়োজনে খুঁটি দেয়, খরার সময় সেচ দেয়া, আগাছা হলে নিড়ানি দেয়, পোকামাকড় ও রোগবালাই আক্রমণ হলে তা সাথে সাথে দমনের ব্যবস্থা নেয়া, পরিপক্ক সবজি সময়মতে সংগ্রহ করা এসব কাজ যথানিয়মে করতে হবে। এজন্য শাকসবজি গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা করা প্রয়োজন।
দানাশস্য খাদ্যে আজ আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। সময় এখন গুণগতমানের খাবার ও পুষ্টির। জমিকে খালি না রেখে শাকসবজি আবাদের আওতায় নিয়ে আসুন। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি হবে, আয় বৃদ্ধি পাবে এবং দেশ সমৃদ্ধ হবে।
- Advertisement -
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.