নির্বিঘ্নে বোরো ধান উৎপাদনে এ সময়ে ধান ফসলে করণীয়
(দুধ আসা থেকে দানা শক্ত হওয়া স্তর পর্যন্ত)
- Advertisement -
নির্বিঘ্নে বোরো ধান উৎপাদনে এ সময়ে ধান ফসলে করণীয়
(দুধ আসা থেকে দানা শক্ত হওয়া স্তর পর্যন্ত)
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
ধান ফসলের তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথমটি হলো দৈহিক বৃদ্ধি পর্যায় পরবর্তীটি প্রজনন পর্যায় এবং তৃতীয় পর্যায় হলো পাকা পর্যায়। আবার ধান গাছের পুরো জীবনচক্রটিকে দশটি (মতান্তরে এগারটি) স্তরে বিভক্ত করা যায়। ধানের সর্ব্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রতিটি স্তরে সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ে অধিকাংশ বোরো ধান গাছ এখন প্রজনন পর্যায় শেষ হয়ে পাকা পর্যায়ে উপনীত হওয়ার উপক্রম। ধানের পাকা পর্যায়ে সাধারণত তিনটি স্তর থাকে। স্তরগুলো হলো দুধ স্তর, ডাফ বা ক্ষীর স্তর এবং পরিপক্ক স্তর।
বোরো ধানের পাকা পর্যায়ের প্রতিটি স্তরই খুবই স্পর্শকাতর। এসব স্তরে যে কোন সমস্যা ধানের ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। তাই ধানের পাকা পর্যায়ে একটু বিশেষ নজর দিয়ে ধানের পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় মাঠ পর্যায়ে সার ব্যবস্থাপনা, আগাছা ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা, বৈরি আবহাওয়া ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও অন্যান্য বালাই ব্যবস্থাপনা ও রোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সার ব্যবস্থাপনা: বোরো ধান ফসলের পাকা পর্যায়ে কোন অবস্থাতেই রাসায়নিক সার দেয়া যাবে না। বিশেষত কোনভাবেই ইউরিয়া সার ব্যবহার করা যাবে না।
আগাছা ব্যবস্থাপনা: নির্বিঘ্নে বোরো ধান উৎপাদনে এসময় ধানের জমিকে অবশ্যই আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
সেচ ব্যবস্থাপনা: বোরো ধানে এই পর্যায়ের স্তরগুলোতে অবশ্যই পরিমিত মাত্রায় পানি রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। দুধ আসা স্তর থেকে চাল শক্ত হওয়া পর্যন্ত ধানের জমিতে অন্তত ৮-১০ সেমি পানি ধরে রাখতে হবে । ধান গাছের এই স্তরগুলোতে পানির অভাব হলে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ ফলন কম হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ধান কাটার ১০-১২ দিন আগ থেকে সেচ প্রদান অবশ্যই বন্ধ রাখতে হবে। নতুবা ধানের পরিপক্কতা আসতে দেরি হবে।
পোকামাকড় ও বালাই ব্যবস্থাপনা:
ধানের জমিতে এ সময় মাজরা পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং, সাদাপিঠ গাছ ফড়িং, গান্ধিপোকা ও ইঁদুরের আক্রমন হতে পারে। এসব পোকার উপস্থিতি নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নিয়মিত আলোক ফাঁদের ব্যবস্থা করতে হবে। জমিতে ডালপালা পুতে পার্চিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পোকার ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। নিয়মিতভাবে ধান গাছের গোড়ায় বাদামী গাছ ফড়িং এবং সাদাপিঠ গাছফড়িংয়ের আক্রমন পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতির মাত্রা অর্থনৈতিক দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন ডায়জিনন, কার্বোফুরান, কার্বোসালফান, মেলাথিয়ন জাতীয় কীটনাশক সঠিক মাত্রায় সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে। বাদামী গাছ ফড়িং এর আক্রমন থেকে রক্ষা পেতে শুরুতেই জমির পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে মিপসিন ৭৫ ডব্লিউজি প্রতি ৫ শতাংশে ২৬ গ্রাম, এডমায়ার ২০ এসএল প্রতি ৫ শতাংশে ২.৫ এমএল, এসাটাফ ৭৫ এসপি প্রতি ৫ শতাংশে ১৫ গ্রাম পরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করে দিতে হবে। ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের জন্য গর্ত খুড়ে ইঁদুর ধরে মারতে হবে। গর্তে শুকনা মরিচের গুড়াসহ আগুনের ধোঁয়া দিতে পারেন। ইঁদুর মারার বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করতে হবে। ইঁদুর দমনের জন্য বাঁশের কঞ্চির মাথায় পলিথিন কাগজ বেধে দিতে পারেন। বাতাসে দুল দুল পলিথিনের শব্দে ইঁদুর মাঠ থেকে পালাবে। সর্বোপরি ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে সামাজিক প্রচেষ্টার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
রোগ ব্যবস্থাপনা:
এ সময় ধানে জমিতে ব্লাস্ট বিশেষত নেক ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও খোল পোড়ার আক্রমন হতে পারে। আক্রমন প্রবণ জাতে আগাম ব্যবস্থা হিসেবে হিনোসান,অটোস্টিন, ট্রুপার অবশ্যই প্রয়োগ করতে হবে। খোলপোড়া রোগের আক্রমনের তীব্রতা বেশি হলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন কনটাফ, ফলিকুর ও এনভিল প্রয়োগ করতে হবে। পাতাপোড়া রোগের জন্য বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ধানের ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে, ধানের শীষ বের হওয়ার আগ মূহুর্তে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ৮ গ্রাম ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি বা ৬ গ্রাম নাটিভো ৭৫ ডব্লিউজি বা ট্রাইসাইক্লাজন/স্ট্রবিন গ্রুপের অনুমোদিত গ্রুপের ছত্রাকনাশক ১০ লিটার পানির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে ৫-৭ দিন পর পর অন্তত ২ বার স্প্রে করে দিতে হবে। ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে জমিতে ১-২ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে এবং বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার ব্যবহার করতে হবে। তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর।
- Advertisement -