- Advertisement -
ধানের পামরী পোকা ও ব্যবস্থাপনা
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
পামরী পোকা ধান ফসলের অন্যতম প্রধান ক্ষতিকর পোকা । বলা হয়ে থাকে, এটি আমাদের দেশে ধানের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা। এর আক্রমণে ধান গাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। ফলে কৃষকরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পামরী পোকার অনুকুল অবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ শতকরা ১০ ভাগ থেকে ৮০ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। সর্বপ্রথম ১৯০৫ সালে এ অঞ্চলের বরিশালে পামরী পোকার অস্তিৃত্ব পাওয়া যায়। এর পরবর্তীতে ১৯১২ সালে সিলেটে এবং ১৯১৩ সালে নোয়াখালীতে পামরী পোকার আক্রমন পরিলক্ষিত হয়। তখন থেকেই মূলত পামরী পোকাটি ধান ফসলের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে পরিচিত হয়। তাছাড়া ১৯৭৮ সাল থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, খুলনা, যশোর এবং ফরিদপুর এসব জেলায় নিয়মিতই এই পোকার আক্রমন দেখা দেয়। তবে ১৯৮১, ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৯২ এবং ১৯৯৯ সালে মারাত্বকভাবে পামরী পোকার আক্রমনের ফলে ২০ ভাগেরও বেশি ধান ফলন কমে গিয়েছিল। পামরী পোকার আক্রমন শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং ভারত, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, লাওস এসব দেশেও আক্রমন হয়ে থাকে।
পামরী পোকার পরিচিতি: পূর্ণ বয়স্ক পামরী পোকার গায়ের রং কালো, একটু চিকচিকে। লম্বায় ৫.৫ মিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে। লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এ পোকার পিঠের উপর অনেক কাঁটা থাকে। পামরী পোকার কীড়া ও পূর্ণ বয়স্ক পোকা উভয়ই ধানের ক্ষতি করে। কীড়াগুলো পাতার দুই পর্দার মধ্যে সুড়ঙ্গ করে সবুজ অংশ খায়। কীড়া আক্রান্ত পাতায় আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করলে সীমের বীচির মত মনে হয়। অনেকগুলো কীড়া এভাবে খাওয়ার ফলে পাতা শুকিয়ে যায়। পূর্ণ বয়স্ক পামরী পোকা পাতার সবুজ অংশ এমনভাবে কুড়ে কুড়ে খায় যে শুধু সাদা পর্দাটা বাকি থাকে। এরা পাতার উপর লম্বালম্বিভাবে খায়। ক্ষতিগ্রস্থ পাতাগুলোর উপর তাই কয়েকটি লম্বালম্বি সমান্তরাল দাগ দেখা যায়।
পামরী পোকার জীবন চক্র: পামরী পোকার জীবনকাল ৩০-৪৮ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। স্ত্রী পোকা ধান গাছের কচি পাতার ডগার দিকে নীচের পার্শ্বে একটি একটি করে ১৮-১০১ টি ডিম পাড়ে। ৪-৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে হলুদ রঙের চ্যাপ্টা আকারের কীড়া বের হয় এবং কীড়াগুলো পাতার ভিতরে ঢুকে পাতার দু’পাশের ছাল ঠিক রেখে ভিতরের সবুজ অংশ কুড়ে খায়। ৭-১২ দিন পর্যন্ত কীড়াগুলো এভাবে সবুজ অংশ খেয়ে পুত্তলীতে পরিণত হয়। পুত্তলী অবস্থায় এরা কিছু না খেয়ে ৪-৫ দিন নিঃসাড় অবস্থায় পড়ে থাকার পর পূর্ণবয়স্ক কালো রঙের পোকায় পরিণত হয়। পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় এরা ১৫-২৫ দিন বাঁচে। এক বছরের মধ্যে এরা ৬ টি বংশ উৎপন্ন করে। প্রথম বংশ বোরো ধানের উপর দ্বিতীয় বংশ হতে পঞ্চম বংশ আউশ ধান ও ষষ্ঠ বংশ আমন ধানের উপর অতিক্রম করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমন মৌসুমে এর প্রার্দুভাব বেশি। তবে আউশ ও বোরো মৌসুমেও আক্রমন করে থাকে। সাধারণত বাড়ন্ত পর্যায়ের ধান গাছে এরা আক্রমন করে তবে ধান পাকার সময় থাকে না। অনুকূল পরিবেশ হিসেবে উচ্চ তাপমাত্রা (২৫-৩০ ডিগ্রী সে.), উচ্চ আর্দ্রতা (৮০%) এর উপর, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, ক্রমাগত দিনরাতের তাপমাত্রা উঠানামা করা, বিকল্প পোষকের উপস্থিতি যেমন আড়াইল ঘাস, শ্যামা ঘাস, আঙ্গুলী ঘাস এসব পরিবেশে পামরী পোকার আক্রমন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
পামরী পোকার সমম্বিত ব্যবস্থাপনা
সুবিধাজনক যে কোন পদ্ধতি এককভাবে অথবা সমন্বিতভাবে অবলম্বন করে এ পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। এ ব্যাপারে নিম্নলিখিত পদ্ধতি সমূহ অনুসরণ করা যেতে পারে : ডিম ও গ্রাব মুক্ত চারা রোপণ করতে হবে; সকল চাষি মিলে একই সময়ে ধান চাষ (সমকালীন চাষাবাদ) করতে হবে; চারা মাটিতে লেগে যাবার পর থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক বার ধান ক্ষেত জরিপ করে পামরী পোকার উপস্থিতি যাচাই করতে হবে; ধানক্ষেতে পূর্ণবয়স্ক পামরী দেখা গেলে তা এলাকার সকল ধান চাষী মিলে একযোগে সকালবেলায় হাতজাল দিয়ে ধরে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে ; পাতায় কীড়া বা গ্রাব দেখা দিলে আক্রান্ত পাতার গোড়া থেকে ২.৫-৪.০ সেন্টিমিটার বা ১-১.৫ ইঞ্চি রেখে বাকী অংশ কীড়াসহ কেটে মাটিতে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে; বিকল্প পোষক যেমন আড়ালী ও দল জাতীয় ঘাস বা আগাছা ইত্যাদি পরিস্কার বা নষ্ট করতে হবে; ফসল কাটার পর জমিতে মুড়ি ফসল রাখা যাবে না; জৈবিক ভাবে দমন যেমন পামরী পোকার ডিম ও কীড়ার পরজীবি ট্রাইকোগ্রামা ও ব্রাকন জাতীয় বোলতা সংরক্ষণ,বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে; পামরী পোকার পরভোজী মাকড়সা, স্টিংক বাগ, ড্রাগন ফ্লাই, পেন্টাটমিড বাগ, লেডি বার্ড বিটল, ক্যারবিড বিটল, ফিঙ্গে পাখি, ব্যাঙ, হাঁস পামরী পোকা শিকার করে; তাছাড়া পামরী পোকা প্রতিরোধশীল জাত যেমন মধ্যম প্রতিরোধশীল ব্রি ধান২৫, ব্রি ধান২৭ এবং কম ক্ষতিপ্রবণ ব্রি ধান২৬, ব্রি ধান৩১, ব্রি ধান৩৫ চাষ করা যেতে পারে; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এলোপাথাড়ি কীটনাশক/বালাইনাশক প্রয়োগ করা যাবে না; এলাকার প্রত্যেক চাষী তার আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশী সকল কৃষককে পামরী পোকা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন কলাকৌশল এক সঙ্গে মেনে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
তারপরও যদি পামরী পোকা দমন না হয় তবে গড়ে গোছা প্রতি ৫টি পূর্ণবয়স্ক পামরী পোকা অথবা কুশি প্রতি ৫টি বাচ্চা পোকা থাকলে বা শতকরা ৩৫ ভাগ পাতায় ক্ষতির লক্ষণ দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে ক্লোরপাইরিফস, কারটাপ ইমিডাক্লোরোপ্রিড, কার্বারিল বা কার্বোসালফান গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। কৃষকের সুবিধার্থে ক্লোরোপাইরিফস গ্রুপের ক্লাসিক বা পাইরিফস বা লিথাল ২ মিলি/লিটার হারে অথবা কারটাপ গ্রুপের কাটাপ বা কারটাপ বা ফরওয়াটাপ প্রতি লিটার পানিতে ১.৬ গ্রাম কীটনাশক মিশিয়ে বিকেল বেলায় স্প্রে করতে হবে।
- Advertisement -
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.