তালগাছ: বজ্রপাত ঠেকানোর মোক্ষম অস্ত্র।
তালগাছ: বজ্রপাত ঠেকানোর মোক্ষম অস্ত্র।
- Advertisement -
তালগাছ: বজ্রপাত ঠেকানোর মোক্ষম অস্ত্র।
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে অন্যান্য সব সৃষ্টিকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। উদ্ভিদ ও প্রাণি জগতের মধ্যে এমন কোন সৃষ্টি নেই, যা মানুষের প্রয়োজনে আসে না। শুধু তাই নয়, প্রকৃতিতে এমন অনেক জিনিস আছে যা উন্নতি, উদারতা, শান্তি, ভালবাসার প্রতীক হিসেবে কাজ করে মানুষের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। যেমন-ফুল প্রেম ভালবাসার প্রতীক হিসেবে মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে, তেমনি একটি বট বৃক্ষ ছায়াতরু হিসেবে পথিকের ক্লান্তি দূর করে। অপরদিকে প্রকৃতিতে এমন কিছু দৃষ্টান্তও রয়েছে যা মানুষকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বড় হতে শেখায়, প্রতিকূল অবস্থায় টিকে থাকার আহ্বান জানায়। তেমনি একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা তালগাছের নাম উল্লেখ করতে পারি। কবির ভাষায়, তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে/ মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যাবে/ একেবারে উড়ে যাবে/ কোথা পাবে পাখা সে?—। তালগাছের এই দৃঢ়তা, স্বাধীনচেতা মনোবাসনা মানব জীবনের চাওয়া পাওয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রত্যেক মানুষই চায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে, বড় হতে, নিজের ও নিজের দেশের স্বাধীনতাকে অটুট রাখতে। তাল গাছ যেমন অন্যান্য গাছের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে নিজের মাথাকে সবার শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করে ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরও উচিত নিজের জীবন ও নিজের দেশকে গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় নামা।
তালের ব্যবহার: পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা তৈরি করে খাওয়া যায়। কচি ফলের নরম ও সাদা শাঁস মিষ্টি ও সুস্বাদু। বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলায় তালের গাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা এলাকায় তাল বেশি উৎপন্ন হয়।
তালের ওষুধিগুণঃ তাল ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার। পাকা তালে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। তালের রস শ্লেষ্মানাশক, মূত্রকর, প্রদাহ ও শোথ নিবারণ করে। রস থেকে তৈরি তালমিসরি সর্দি কাশির মহৌষধ। যকৃতের দোষ নিবারক ও পিত্তনাশক।
তালগাছের চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা
বীজ বপনের সময়ঃ ভাদ্র হতে কার্তিক মাস বীজ বপনের উপযুক্ত সময়।
বীজ বপনের দূরত্বঃ সারি থেকে সারি ৭ মিটার (২৩ ফুট) ও চারা থেকে চারা ৭ মিটার (২৩ ফুট) হওয়া উত্তম।
গর্ত তৈরি ও প্রাথমিক সারঃ গর্তের আকার হবে ১ মিটার চওড়া ও ১ মিটার গভীর। গর্ত করার ১০-১৫ দিন পর প্রতি গর্তে ১৫-২০ কেজি জৈব সার, ২৫০ গ্রাম টিএসপি ও ২০০ গ্রাম এমওপি মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে।
বীজ বপনঃ গর্ত ভর্তি করার ১০-১৫ দিন পর গর্তের মাঝখানে বীজ বপন করতে হবে।
সার প্রয়োগঃ প্রতি বছরই বর্ষার আগে ও পরে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স বাড়ার সাথে প্রতি বছর সারের মাত্রা ১০ ভাগ হারে বাড়িয়ে দিতে হবে। পূর্ণবয়স্ক গাছে প্রতি বছর ১৫-২০ কেজি গোবর সার, ১ কেজি ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টিএসপি ও ৫০০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। সার প্রয়োগের পরপরই পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিচর্যাঃ সার প্রয়োগ ব্যতিরেকে নিয়মিত আগাছা পরিস্কার, সেচ ও নিকাশের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অনেকেই মনে করেন তালের বীজ রোপন করে জীবদ্দশায় তাল খাওয়া যায় না। কথাটি কোন মতেই ঠিক না। কেননা নিয়মিত যতœ ও পরিচর্যা নিশ্চিত করলে ১০-১২ বছরের মধ্যেই তাল খাওয়া যায়। একটু সচেতন ভাবে পাতা কাটলে গাছের ক্ষতি কম হয় এবং বহুমুখী লাভ আসে।
ফল সংগ্রহঃ শ্রাবণ – ভাদ্র মাসে ফল পাকতে শুরু করে।
সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বৃষ্টিপাত, অতি বৃষ্টিপাত, শিলা বৃষ্টি, বজ্রপাত, খরা এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দুর্যোগে সীমাহীন ফসলহানি হচ্ছে। বজ্রপাতে মানবজীবনও বিনাশ হচ্ছে। এমন বৈরী আবহাওয়া বিশেষ করে বজ্রপাতরোধে তাল গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাল ফল সম্প্রসারণ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। সরকার চলতি বছরে প্রায় ১০ লক্ষ তাল গাছ রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতীয় পর্যায়ে গৃহিত তাল গাছ রোপণ কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এক বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। হাওর এলাকায়, রাস্তার ধারে, চিংড়ির ঘেরে, বাঁধের পার্শ্বে মডেল আকারে তালের চারা রোপণ করার বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তালগাছ রোপণের ক্ষেত্রে বারোমাসি তাল গাছের বীজ রোপনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। তালগাছের ব্যবহার ও উপকারিতার কথা আমাদের সবারই জানা। তবে এ গাছটি অযত্ন, অবহেলায় যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে বলে আমরা অনেকেই আবার এর সঠিক মূল্যায়ন করি না। কিন্তু তাল যে একটি উপকারি বৃক্ষ সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নেই, তাই আমাদের সবারই উচিত পরিকল্পিতভাবে তালের চারা রোপণ এবং এ চাষাবাদ সম্প্রসারণ করা।
- Advertisement -
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.