- Advertisement -

বজ্রপাত: বিপন্ন কৃষকের জীবন; নিরাময়ে বৃক্ষরোপণ।

বজ্রপাত

248

- Advertisement -

 

বজ্রপাত: বিপন্ন কৃষকের জীবন; নিরাময়ে বৃক্ষরোপণ।

সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাত আতঙ্কে ভুগছে সবাই। কোন কারণ ছাড়াই মানুষ, পশুপাখি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এক বিভীষিকার নাম বজ্রপাত। সভ্য মানুষের অসভ্য চাপে ধরিত্রী আজ বড়ই বিপন্ন। গোটা পৃথিবী আজ এক কঠিন সংকটে নিপতিত। যে সংকট মানুষ নিজেই সৃষ্টি করেছে, এমনকি প্রতিদিন সংকটকে ঘনীভূত করে চলেছে। শিল্প কারখানার অবাধ বিচরণ, বনাঞ্চল ধ্বংস, মাটির তলা থেকে বেশুমার তেল তুলে ও পুড়িয়ে মানুষ বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের মানুষ আরাম-আয়েশী জীবন কাটাচ্ছে। তাতে বেড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, পর্বতশীর্ষে ও মেরু এলাকায় জমে থাকা বরফ গলছে অতি দ্রুততায়। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা। পরিবেশ বিজ্ঞানীগণ সতর্ক করে আসছেন, এভাবে বিশ্বের উষ্ণতা আর দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে গেলে পৃথিবীর বহু ভূ-ভাগ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এ তালিকায় বাংলাদেশের স্থান আশংকাজনক। বলা হচ্ছে, বর্তমান হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আর মাত্র ১৫-২০ বছরেই বাংলাদেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে। লবণাক্ততা গ্রাস করবে প্রায় সমগ্র বাংলাদেশকেই। আর ভূমিকম্প, প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস, খরা, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হবে। প্রাকৃতিক নানাবিধ বিপর্যয়ের মধ্যে হঠাৎ সমসাময়িক একটা অশনি বিপদ সংকেত যার নাম বজ্রপাত।

বজ্রপাত: চোখ ধাঁধানো আলোকিত বিজলির ঝলকানি আর উচ্চমাত্রার শব্দের সমন্বয়ের প্রভাবে একটা প্রচন্ড ঝড়-ঝটিকা বা ঝঞ্ঝাই হলো বজ্রপাত। একে বৈদ্যুতিক ঝটিকা বা বিজলি ঝড়ও বলা হয়ে থাকে। আকাশে ভাসমান মেঘগুলো একসাথে পুঞ্জীভূত হয়েই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় ৫ গুণ বেশি তাপমাত্রা ক্ষমতা সম্পন্ন এবং নিমিষেই বা সেকেন্ডের ক্ষুদ্র সময়ে একজন মানুষ মারা যেতে পারে এই বজ্রপাতে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প তৈরি হয় যা মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের উপরে চলে আসে। এদিকে উত্তর দিক থেকে উষ্ণতা নিয়ে জলীয় বাষ্প আসায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। এর মূল কারণ হচ্ছে, তীব্রতর বজ্রমেঘ তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার অঞ্চলে। এগুলো পূর্ণতা পায় বাংলাদেশে।

বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি আশঙ্কাজকভাবে বেড়ে গেছে। দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৭৯ জন, ২০১২ সালে মারা যায় ২০১ জন এবং ২০১৩ সালে ২৮৫ জন। বজ্রপাতের ঘটনা ক্রমে ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রে (এসএমআরসি) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সার্কভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে বজ্রপাতের সংখ্যা ও প্রাণহানির দিক দিয়ে বাংলাদেশ সর্ব্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সার্কভূক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বজ্রপাতে এখানে মৃত্যুও হার বেশি। সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে মারা যায় ৫০০ থেকে ৮০০ লোক। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটিং সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর সারা বিশ্বে বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার এক-চর্তুথাংশ ঘটে বাংলাদেশে। এসএমআরসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪০ টি বজ্রপাত হয়। এতে বছরে মাত্র ১৫০ বা তার কিছু বেশি লোকের মৃত্যুও খবর গণমাধ্যমে ছাপা হয় বাকি মৃত্যুগুলো অন্তরালেই রয়ে যায়। ধারণা করা হয় বজ্রপাত জনিত মৃত্যুসংখ্যা ৫০০ থেকে ৮০০ জন হবে। এসএমআরসির বাংলাদেশ কার্যালয় মতে, বাংলাদেশে বজ্রপাত ও এর ফলে মৃত্যু-দুটোই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

এক গবেষণামূলক জরিপ মোতাবেক, বাংলাদেশে মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়ে থাকে। সাধারণত অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘলা আকাশ বজ্রপাত ঘটার গুরুত্বপূর্ণ সময়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষই বজ্রপাতে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। ডেইলি স্টার পত্রিকার পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট মোতাবেক, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় কৃষক বা কৃষিজীবি মানুষ (প্রায় ৫১%) এবং ফসলের মাঠে কর্মরত অবস্থায় অধিকাংশ কৃষক বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বজ্রপাতের শিকারের প্রায় ১১% হলো স্কুল শিশু,স্কুলে যাওয়া আসার পথেই এ ঘটনার শিকার হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় ঘরে থাকাও যথেষ্ট নিরাপদ নয়, কারণ বজ্রপাত শিকারের প্রায় ২২% মানুষ ঘরে থাকা অবস্থায় মারা যায়। তাছাড়া বজ্রপাত আঘাতের শিকার হয় প্রায় ১২% রাস্তাঘাটে এবং প্রায় ১৪% পানিতে থাকা অবস্থায়। বাংলাদেশে মূলত এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে অধিকাংশ বজ্রপাত সংঘটিত হয়ে থাকে। নভেম্বর থেকে ফেব্রয়ারি মাসগুলো বজ্রপাতের শিকার হওয়া থেকে নিরাপদ। গবেষণায় আরোও দেখা যায়, মোট বজ্রপাত আক্রান্তের প্রায় ৮১% মানুষ সকাল ৬.০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬.০০টার মধ্যে শিকার হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাগুলোকে বজ্রপাত ঝুঁিক বা বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

বজ্রপাতের কারণ

গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সাথে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম নির্বিচারে বনাঞ্চল নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন। বলা হয়ে থাকে, আগে মাঠে ময়দানে বড় বড় বৃহৎ গাছপালা ছিল। বড় বড় গাছ যেমন বটগাছ, পাকুর গাছ, শিমুল গাছ এসব গাছ বজ্রপাতের তীব্র আলোক তাপকে শোষণ করে নিত। ফলে জীবনহানি কম হতো। জনসংখ্যার আধিক্য, বসতবাড়ি তৈরি, রাস্তাঘাট তৈরি এসব নানাবিধ কারণে বড় বড় গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজন মোতাবেক নতুন করে গাছ রোপণ করা হচ্ছে না। তাই দিন দিন বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি বজ্রপাতের শিকারে মানুষ মারা যাওয়ার সংখ্যার আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬ সালে এপ্রিল, মে, জুন মাসে ব্যাপক বজ্রপাত সংঘটিত হয়েছে। অনেক মানুষ মারা গেছে।

বজ্রপাত নিরাময়

বজ্রপাত নিরাময়ের কোন কৌশল এখনই আবিষ্কৃত হয়নি। তবে বজ্রপাতের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এই ভয়ংকর আতঙ্কের বাইরে কেউ নেই। যে কেউ যে কোন সময় বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। তাই বজ্রপাতের তীব্রতা ও পরিমাণ কমানোর জন্য বেশি বেশি গাছ লাগানোর বিকল্প নেই। অন্যান্য আরোও বহুবিধ গুরুত্বের পাশাপাশি বজ্রপাত মোকাবিলায় গাছ লাগানো দরকার ধরিত্রীতে আবারোও ফিরিয়ে দিতে হবে বড় বড় বৃক্ষ। বিশেষ করে, মাঠে ময়দানে, খোলা জায়গায়, হাওর বাওর এসব জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। তাই বজ্রপাত ব্যবস্থাপনায় বৃক্ষরোপণই হবে সহজ সমাধান।

পৌন:পুনিক ভূমিকম্পের দেশ জাপান, লস এঞ্জেলস যদি টিকে থাকতে পারে, সুনামি-সাইক্লোনের জন্য খ্যাত ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কঙ্গো যদি টিকে থাকতে পারে তাহলে বাংলাদেশও হাজার প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে মাথা উচুঁ করে সগৌরবে দাড়িয়ে থাকতে পারবে। বজ্রপাত মোকাবিলা করার জন্য দরকার প্রচুর গবেষণা, গবেষণালব্দ জ্ঞান মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন, পরিকল্পিত টেকসই ও স্থায়ী ব্যবস্থা, সম্মিলিত পরিকল্পিত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো দুর্যোগই প্রতিহত করা সম্ভব নয়, বরং তার ব্যবস্থাপনা যত ভালো হয় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত কমানো যায়। বজ্রপাত কমানোতে চলুন সবাই বেশি বেশি গাছ লাগাই। বড় বড় গাছগুলো নিধন বন্ধ করি।

লেখক: কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ।

 

- Advertisement -

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.