বারহাট্টায় ভাসমান বেডে আমন বীজতলা
- Advertisement -
বারহাট্টায় ভাসমান বেডে বীজতলা
অসময়ের বন্যায় রোপা আমন বীজতলা তৈরিতে কৃষক প্রতিবছরই হিমসিম খায়। বর্তমানে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব প্রকট। বাংলার প্রকৃতিতে বর্ষা কখনও আগে আসে, কখনওবা বেশ দেরিতে। তাই সঠিক সময়ে বীজতলা তৈরি করাও কঠিন হয়ে যায়। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরই তাই হয়েছে। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি ধেয়ে এসে নেত্রকোনার মগড়া, কংস, ধনু, সুমেশ্বরী বিধৌত অসংখ্য হাওর-বাওড় ও নদী-নালা প্লাবিত হয়। আগাম বন্যায় আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার জমিতে চারা রোপণের পর নাবি বন্যায় রোপণকৃত জমি নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে কৃষকেরা হালিচারার সংকটে পড়ে যায়, এর ফলে আমন ধান উৎপাদন মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশণায় নির্বিঘেœ আমন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যে আপদকালীন সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ভাসমান বীজতলা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণের অধিদপ্তরের কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বারহাট্টায় ১২ টি এবং উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে আরোও ০৫ টি ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। গুহিয়ালা সিআইজি কৃষক সমবায় সমিতির সহায়তায় গুহিয়ালা গ্রামের বিলের পানিতে ভাসমান বীজতলাগুলো মনের আঙ্গুলে ভেসে আছে। প্রতিনিয়ত শতশত মানুষ রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বীজতলা দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক, নেত্রকোণা; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক; চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ, বারহাট্টা; উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বারহাট্টা; এসিল্যান্ডসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ভাসমান বীজতলাগুলো পরিদর্শন করেছেন।
ভবিষ্যতে আপদকালীন সময়ে এসব বীজতলা ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জনাব মোহাইমিনুর রশিদ, উপজেলা কৃষি অফিসার, বারহাট্টা বলেন ভাসমান বীজতলার সুবিধা হলো আপদকালীন সময়ে হালিচারার যোগান নিশ্চিত করে। জলাবদ্ধ এলাকায় নাবিতে চারা রোপণের জন্য সঠিক বয়সের চারা নিশ্চিত করে। কচুরিপানা দ্বারা তৈরি ভাসমান বীজতলায় উৎপাদিত জৈবসার বাড়তি সুবিধা হিসেবে কৃষকরা পেয়ে থাকেন। তিনি আরোও বলেন, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ভাসমান বীজতলা স্থাপনের উপযুক্ত সময়। প্রতিটি ভাসমান বেড ১.০ মিটার থেকে ১.২৫ মিটার প্রস্থ এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০ মিটার হলে উত্তম। মূলত নাবি জাতের ধান যথা বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৪৬ এবং স্থানীয় জাত বিরই, নাইজারশাইল, গাইঞ্জা, গড়িয়া, পরাঙ্গি, সাইট্যা, তুলশিমালা এসব জাতের ধানের বীজ বপন করা হয়। ভাসমান বীজতলায় দুইটি পদ্ধতিতে রোপা আমনের চারা তৈরি করা যায়। প্রথমত কলার ভেলায় ভাসমান বীজতলা, বন্যাকবলিত এলাকায় যদি বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকে এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চারা তৈরির প্রয়োজনীয় সময় না থাকে তবে বন্যার পানি নদীর পানি, বিলের পানি, পুকুরের পানি, ডোবা বা খালের পানি ওপর কলাগাছের ভেলার ওপর হোগলার চাটাই দিয়ে সেখানে মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি করে কিংবা বাঁশ এবং বাঁশের চাটাইয়ের মাচা দিয়ে তৈরিকৃত বেডের ওপর ২-৩ সেন্টিমিটার পরিমান পুকুরের তলার মাটির পাতলা কাদার প্রলেপ দিয়ে ভেজা বীজতলা তৈরি করা যায়। দ্বিতীয়ত বিল ঝিল বা নিচু জায়গায় কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান বীজতলা করা যায়। প্রথমে কচুরিপানাগুলো স্তুপ করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে বেড আকৃতি করা হয়। বেডের চারপাশে জড়িয়ে থাকা বাড়তি কচুরিপানাগুলো দা দিয়ে কেটে সোজা করে নিতে হয়। অত:পর বেডের ওপর ২-৩ সেন্টিমিটার কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে সমান করে বীজতলা তৈরি করা হয়। বন্যার পানিতে যেন ভেসে না যায় সেজন্য ভাসমান বীজতলা বেডকে দড়ির সাহায্যে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতে হবে। তাছাড়া হাঁসের আক্রমন থেকে বীজতলাকে রক্ষা করার জন্য জাল দ্বারা বেড়া দিয়ে দিতে হবে। এরপর মাটির আস্তরণের ওপর অঙ্কুরিত বীজ ছিটিয়ে দিতে হবে। ভাসমান বীজতলার ক্ষেত্রে অন্য স্বাভাবিক বীজতলার মতোই বীজের হার প্রতি বর্গমিটারে ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম হবে। এক্ষেত্রে এক বিঘা জমি রোপণের জন্য ৩৫ বর্গমিটার বা প্রায় ১ শতক ভাসমান বীজতলা ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিনের চারা উঠিয়ে মাঠে রোপণ করা যেতে পারে। এভাবে তৈরি চারা অন্য সব স্বাভাবিক চারার মতোই রোপণ করতে হবে। ভাসমান বীজতলায় পরিচর্যা হিসেবে নিয়মিত পরিদর্শন করা, পানিতে ভাসমান থাকার জন্য এ বীজতলায় সাধারণত সেচের দরকার হয় না, তবে মাঝে মধ্যে প্রয়োজনে ছিটিয়ে পানি দেয়া যেতে পারে। বীজতলায় থ্রিপস পোকার আক্রমন হলে প্রয়োজনীয় মাত্রায় অনুমোদিত কীটনাশক স্প্রে করা উচিত। প্রয়োজনে সঠিক মাত্রায় ইউরিয়া সার ও থিওবিট স্প্রে করা যেতে পারে। এভাবে উৎপাদিত চারা অন্য সব স্বাভাবিক চারার মতোই ফলন দেয়।
উল্লেখ্য যে, বারহাট্টার গুহিয়ালা গ্রামে ১২ টি ভাসমান বেডে বীজতলা পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক জনাব মঈনউল ইসলাম, উপপরিচালক জনাব মো. হাবিবুর রহমান, জনাব মুহাম্মদ মাইনুল হক, চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ; জনাব ফরিদা ইয়াসমিন, ইউএনও; জনাব সাদিয়া উম্মুল বানিন, এসিল্যান্ডসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ..সবাই প্রযুক্তির সফলতা কামনা করেছেন।
- Advertisement -
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.