- Advertisement -
ইঁদুর বৃত্তান্ত ও দমন ব্যবস্থাপনা
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে ইঁদুর সবচেয়ে ক্ষতিকর একটি বালাই। মাঠ ফসল, গুদামজাত শস্য, ফল, শাকসবজি, ঘরের আসবাবপত্র, কাগজপত্র সহ এমন কোন জিনিষ নেই ইঁদুর ক্ষতি করে না। ইঁদুর মাঠে গড়ে ১ বৎসর বাঁচে। ইঁদুর জন্মের তিন মাস পর গর্ভধারণ করতে পারে। বছরে ৩-৫ বার বাচ্চা দিয়ে থাকে। বাচ্চা প্রসবের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পূরণরায় গর্ভধারণ করতে পারে। প্রতি বার ২-১৪ টি বাচ্চা প্রসব করে। ইঁদুরের বংশ দ্রুত বাড়ে কারণ উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এক জোড়া ইঁদুর বছরে ২৫০০-৩০০০ টি ইঁদুর জন্ম দিতে পারে। ইঁদুর স্তন্যপায়ী প্রাণী। ইঁদুরের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একজোড়া ছেদন বা কর্তন দাঁত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাঠ, সিমেন্টের মেঝে, ইলেকট্রিক তারের আবরণ, চিকন তার, সীসা, এলুমিনিয়াম, কাপড়চোপর, আসবাবপত্র, বাড়ির দলিলপত্র, মূল্যবান কাগজপত্র ইঁদুর কেটে নষ্ট করে। অর্থাৎ ইঁদুরের হাত থেকে এমন কোন জিনিস নেই যে নষ্ট থেকে রক্ষা পাবে। এমন কি সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়েতেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। অর্থৎ ইঁদুর ক্ষতিকারক ইতর প্রাণী, যা মানুষের পরম শক্র।
ইঁদুর মারার প্রয়োজনীয়তা: চারটি কারনে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন (ক) ইঁদুর দ্বারা মানুষ ও পশু পাখির মধ্যে মারাত্বক রোগের বিস্তার ঘটে (খ) ইঁদুর মাঠের ফসল, ফল, শাক-সবজি, গুদামের খাদ্য ইত্যাদি খেয়ে ফেলে অথবা নষ্ট করে । ইহা ছাড়া যত খায় তার ৫-৭ গুন নষ্ট করে (গ) পানির পাইপ, গুদামের জিনিষপত্র, বই পুস্তক ইত্যাদি কেটে নষ্ট কবে। বৈদ্যুতিক তার কেটে অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি করে। সেচের গর্ত খুড়ার ফলে পানির অপচয় হয়। সড়ক ও বাধে গর্ত খুড়ে ক্ষতি সাধন করে (ঘ) ইঁদুরের মলমুত্র ও লোম ফেলে পরিবেশকে দুষিত করে। এক জোড়া ইঁদুর প্রতি বছর ৩৬,০০০টি মল এবং এক লক্ষ লোম দেহ থেকে ফেলে। তাছাড়া ইঁদুর যেমন দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে তেমনি ফসলের বা অন্য যে কোন সম্পদের দ্রুত ধ্বংস করে। প্রতি বছর ৮-১০ লক্ষ টন খাদ্য শস্য ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। মারাত্নক কিছু রোগ প্লেগ, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েড ও চর্মরোগসহ প্রায় ৩০ প্রকার রোগ ইঁদুর দ্বারা বিস্তার ঘটে। মাঠ ফসলে ধানের থোর আশার আগ পর্যন্ত ইঁদুর ধান গাছ কেটে ফসলের তেমন একটা ক্ষতি করতে পারে না। ধান পাকার সময় ধানের জমিতে পানি শুকিয়ে গেলে ইঁদুর সেখানে গর্ত করে বাস করে এবং ধান গাছের শিষ কেটে গর্তে নিয়ে জমা করে ফসলের ফলন কমিয়ে দেয়।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
বাসস্থান:কিছু ইঁদুরের প্রজাতি অধিকাংশ সময় গর্তে থাকে। এদের গর্ত সাধারণতঃ লম্বায় ১০ মিটারের বেশী এবং গভীরতায় ১ মিটার হয়ে থাকে। কিছু প্রজাতি আছে গুদামে ও ঘরে বাস করে।
স্বভাব: ছেদন দন্ত ঠিক রাখার জন্য সব সময় শক্ত জিনিস কাটে।
চক্ষু: শুধু চলাফেরার কাজে ব্যবহার হয়, কোন রঙ নির্নয় করতে পারেনা।
লেজ: দেহের ভার রক্ষার কাজে ব্যবহার করে।
স্পর্শক ইন্দ্রিয়: গোঁফ স্পর্শক ইন্দ্রিয়ের কাজ করে। ইহার সাহায্যে গর্তের আকার এবং অন্ধকারে জিনিষ নির্ণয় করে থাকে।
শ্রবন ইন্দ্রিয়: শ্রবন ইন্দ্রিয় খুব প্রখর, শব্দের মাধ্যমে বিপদ সংকেত প্রেরণ করে।
স্বাদ ইন্দ্রিয়: জিহবা দ্বারা টক, মিষ্টি ও তিতা ধরতে পারে।
ঘ্রাণ: পুরুষ ইঁদুর স্ত্রী ইঁদুরের মুত্রের ঘ্রাণ নিয়ে বুঝতে পারে ঐ ইঁদুরটিও মিলনের উপযুক্ত কি না অথবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিংবা গর্ভবর্তী।
চলাচলের রাস্তা: সচরাচর একই লক্ষ্যে চলাফেরা করে।
খাদ্যাভাস
ইঁদুরের শ্রবণ, ঘ্রাণ ও স্বাদ গ্রহণ করার শক্তি অত্যন্ত প্রখর। ইঁদুর সহজে কোন অচেনা খাদ্য বস্তু গ্রহণ করতে চায় না। খাদ্য গ্রহণের আগে প্রথমে খাদ্যের ঘ্রাণ ও পরে অল্প কিছু খাদ্য খেয়ে পরীক্ষা করে দেখে এতে কোন প্রকার অসুবিধা হয় কি না। খারাপ অনুভব করলে ইঁদুর সে খাদ্য আর খায় না। বিভিন্ন ইঁদুরের খাদ্যাভাস বিভিন্ন রকমের। ময়লাযুক্ত ও পুরাতন খাদ্য পছন্দ করে না। টাটকা ও দানাদার খাদ্য বেশী পছন্দ করে। ০.৪ – ০.৭ মিলি মিটার আকৃতির খাবার বেশী পছন্দনীয়। প্রতি ইঁদুর দেহের ওজনের শতকরা ১০- ভাগ খাবার গ্রহণ করে। বড় ও মাঝারী ইঁদুর প্রতিদিন ২৮ গ্রামের উর্দ্ধে শুকনা খাদ্য গ্রহণ করে ও পানি ছাড়া কয়েকদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। গর্ভাবস্থায় স্ত্রী ইঁদুর বেশী খাবার গ্রহণ করে। ইহারা সাধারনতঃ সন্ধ্যায় ও ভোর রাতে খাদ্য গ্রহণ করে।
ইঁদুরের উপস্থিতির নির্দেশক
শব্দ কর্তনের শব্দ, কোন কিছু ধেয়ে উঠার বা নামার শব্দ, চলার শব্দ।
মল চলাচলের রাস্তায়, আশ্রয়স্থল ও অন্যান্য স্থানে যেখানে সে গমন করে মল দেখতে পাওয়া যায়।
মূত্র মুত্র গন্ধযুক্ত।
গন্ধ ইঁদুরের উপস্থিতির গন্ধ পাওয়া যায়।
গর্ত ঘরে বা জমিতে মাটি তোলা অথবা গর্ত দেখে ইঁদুরের উপস্থিতি বোঝা যায়।
নোংরা দাগ চলাচলের রাস্তায় নোংরা বস্তুর দাগ পড়ে।
চলাচলের রাস্তা যেখান দিয়ে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বার বার যাতায়াত করে সেখানে পথের সৃষ্টি হয়।
ছাপ ময়লাযুক্ত স্থানে বা মাটিতে ইঁদুরের পায়ের ছাপ অথবা লেজের চিহ্ন দেখা যায়।
কর্তন ইঁদুরের আক্রমনের ফলে ক্ষতি চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।
কর্তনকৃত শস্য বা খাদ্য অংশ কর্তনকৃত শস্য বা খাদ্য অংশ ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
পোষা প্রাণীর উত্তেজনা ঘরে বা অন্য কোথাও ইঁদুরের উপস্থিতি হলে বিড়াল বা কুকুর উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
বায়োলজি
জীবনকাল : মাঠে ১-২ বছর, বাড়িতে ৬ মাস- ১ বছর, ল্যাবরেটরীতে ৩-৫ বছর।
যৌন পরিপক্কতা : ২৫ দিন।
প্রজনন ক্ষমতা : বছরে ৩-৫ বার বাচ্চা দিতে পারে।
হিট পিরিয়ড : ৫-৭ দিন পর পর।
গর্ভধারন কাল : ১৯-২২ দিন।
গর্ভধারন ক্ষমতা : প্রসবের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে রিসিভটিভ হয়।
পপুলেশন ডিনামিক্স
একজোড়া ইঁদুর প্রতি ৩ মাস পর পর বাচ্চা দিলে প্রতি বারে ৬টি বাচ্চা প্রসব করলে এবং স্ত্রী পুরুষের অনুপাত ১:১ হলে-
সময়কাল স্ত্রী পুরুষ সাব-টোটাল মোট
১ম মাসে ৩ ৩ ৬ ৬
৪র্থ মাসে ১২ ১২ ২৪ ৩০
৭ম মাসে ৪৮ ৪৮ ৯৬ ১২৬
১০ম মাসে ১৯২ ১৯২ ৩৮৫ ৫১০
১৩তম মাসে ৭৬৮ ৭৬৮ ১৫৩৬ ২০৪৬
দৈনন্দিন কার্যক্রম
– সূর্যাস্তের পর থেকে খাবার সংগ্রহের কাজ করে।
– দিনের বেলায় নীরব স্থলে খাদ্য সংগ্রহ করে।
– রাতের প্রথম ও শেষ ভাগে যৌন মিলনে কাজ সম্পন্ন করে।
– পুরাতন গর্তে দিনের বেলায় এবং নতুন স্থানে রাতের বেলায় গর্ত খনন করে।
ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময়, স্তর ও স্থান
– ধানের বীজতলায়, ধান থোড় হওয়ার পূর্বে, আমন ধানে আগষ্ট- অক্টোবর মাসে।
– সেচ নালায় পানি ছাড়ার পূর্বে অর্থাৎ মৌসুমের শুরুতে।
– লাউ, শশা, তরমুজ, গোল আলু লাগানোর সময় জমিতে ও আইলে
– মিষ্টি আলু, টমেটো ফল ধরার পূর্বে।
– আখ চারা লাগানোর পূর্বে মাঠে ও আইলে।
– গম ফসলে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে।
– রেল লাইন, সড়ক ও বাঁধে জুন-আগষ্ট মাসে।
ইঁদুরের ক্ষতিকারক প্রজাতি ও ইহার বৈশিষ্ট্য
মাঠের কালো ইঁদুর : শরীরের উপরের অংশ কালচে ধুসর ও পেটের অংশ হালকা ধুসর রঙ বিশিষ্ট লেজের রঙ কালো। লেজ দেহ থেকে ছোট। ওজন ১৫০ – ৩০০ গ্রাম। সাধারণতঃ উঁচু স্থাতে উঠতে পারেনা। গর্ত করতে পারদর্শী। গর্তের মুখে মাটির ডিবি তৈরী করে। ভোরে ও সন্ধ্যায় এরা বেশী সক্রিয় থাকে। উত্তেজিত অবস্থায় গায়ের লোম খাড়া হয়। এ প্রজাতি এক রাতে ২০০ -৩০০ টি কুশি কাটতে পারে।
মাঠের বড় কালো ইঁদুর: কালো ইঁদুর এর ন্যায় দেখতে তবে আকারে বড়। সাধারণতঃ ৩৫০ – ১০০ গ্রাম ওজন হয়ে থাকে। পেছনের কেশ বড় এবং কালে রগের হয়ে থাকে। আর্দ্র বীজতলা এবং ভাসা আমন ধানে বেশী ক্ষতি করে।
গেছো ইঁদুর : লোমের রং বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। বুকের রঙ সাধারণত সাদা, ওজন ৫০ গ্রামের কম। গাছে উঠতে পারে, গর্ভকাল ২১ দিন।
বাদামী ইঁদুর: নাকের অগ্রভাগ কিছুটা ভোতা ও এর সাদা মাথাসহ শরীরের চেয়ে লেজ ছোট। গর্ভকাল ২৪ দিন।
নেংটি ইঁদুর : ধুসর বা বাদামী রঙের হয়। ওজন ২০ গ্রাম হয়ে থাকে। লেজ দেহ থেকে লম্বা। গর্ভকাল ২০-২১ দিন। গুদাম ও ঘর বাড়িতে ক্ষতি করে।
ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা-
ইঁদুর মানুষের খাদ্যে ভাগ বসায় এবং মরণব্যাধি প্লেগসহ ৩০টি রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে তাই ইঁদুর দমন করা আমাদের জরুরী দরকার। এজন্য দরকার সঠিক সময় সঠিক দমন পদ্ধতি প্রয়োগ করা। ফসলের থোর আসার আগেই দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা ভালো। এতে খরচ ও পরিশ্রম অনেক কম লাগে। অনেক সময় দেখা যায় সময়মত দমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়ে যায়। ইঁদুর দমনের জন্য বিভিন্ন কার্যকরী দমন ব্যবস্থা আছে। মূলত দমন পদ্ধতি নির্ভর করে ইঁদুরের উপস্থিতি, কোন ফসলে কি ধরণের ক্ষতি করেছে, ফসলের মূল্য, ক্ষতির পরিমাণ, সহজতম দমন পদ্ধতি এসবের ওপর। দমন ব্যবস্থাটাকে আমরা প্রথমত: দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি অরাসায়নিক পদ্ধতি এবং অপরটি রাসায়নিক পদ্ধতি।
অরাসায়নিক পদ্ধতি-
কোন প্রকার বিষ বা বিষটোপ ব্যবহার না করে অর্থাৎ অরাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন প্রচেষ্টা বহুদিন আগে থেকেই চলে আসছে এবং এখনো চলছে। অরাসায়নিক পদ্ধতি আবার বেশ কয়েক ধরণের হতে পারে। ইঁরের ফাঁদ ব্যবহার- নিভিন্ন ধরণের ফাঁদের ভেতর টোপ হিসেবে শুঁটকি মাছ, নারকেল কোরা, বিস্কুট, রুটি এসব ইঁদুরের লোভনীয় খাবার, এসব ব্যবহার করে ইঁদুর ধরা যায়। জমির আইল চিকন রাখা- জমির আইল ছেঁটে ছোট বা চিকন করে রাখতে হবে, যাতে ইঁদুর জমির আইলে গর্ত করে বসবাস করতে না পারে।
ইঁদুরের গর্তে পানি দিয়ে– ইঁদুরের গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুর দমন সম্ভব। গর্তে পানি দিলে ইঁদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করবে, তখন একে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে। গর্ত খনন করে- ইঁদুরের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে অর্থাৎ নতুন গর্তের মাটি খুঁড়ে ইঁদুর দমন করা যায়। গর্তে ধোঁয়া ব্যবহার করে- শুকনা মরিচ পোড়া ধোঁয়া গর্তে ঢুকিয়ে দিলে ইঁদুর গর্ত থেকে বের হয়ে আসবে, তখন একে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে। সমকালীন চাষাবাদ- মাঠে সবাই মিলে একসাথে ফসল রোপণ বা বপন এবং একসাথে কেটে আনলে ইঁদুর অনেক দিন মাঠে খাবার না পেয়ে পরোক্ষভাবে ইঁদুর দমনে সহায়ক হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রেখে- ঘরবাড়ি, গুদাম ও জমির আশপাশে আবর্জনা, আগাছা ও ঝোপ-জঙ্গল নষ্ট করে, বাড়িতে উচ্ছিষ্ট বা বাড়তি খাবার যত্রতত্র না ফেলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইঁদুর দমন করা সম্ভব। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে- ঘরবাড়ি, খাদ্যগুদাম এবং দালান কোঠায় ধাতবপাত বা তারের জালি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ইঁদুরের প্রবেশ বন্ধ করা যায়। বৈদ্যুতিক বাঁধা সৃষ্টি করে- কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় তারের বেড়ার মধ্য দিয়ে স্বল্প বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে ইঁদুর দমন সম্ভব। আঠা ব্যবহারের মাধ্যমে- ইঁদুর ধরার জন্য গুদামে বা ঘরে এক প্রকার আঠা সাধারণত কাঠ বোর্ডে, শক্ত মোটা কাগজ, টিন, প্লাষ্টিকে টাইলস এ ধনের বস্তুতে প্রলেপ দিয়ে ইঁদুর চলাচলের রাস্তায় ব্যবহার করা হয়। ইঁদুর খাবার খেতে এসে আঠার সংস্পর্শে পা, লোম আটকিয়ে যায়, এর ফলে নড়াচড়া করতে পারে না। এ ধরনের আঠা ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করা যায়। ইঁদুরের লেজ সংগ্রহের মাধ্যমে- সরকারীভাবে বা বেসরকারীভাবে ইঁদুরের লেজের বিনিময়ে টাকা পয়সা দিয়ে ইঁদুর দমনের ব্যবসাথা করা যেতে পারে। জৈবনিয়ন্ত্রণ বা পরভোজী প্রাণীর মাধ্যমে- জীবিত কোন প্রাণীকে অন্য কোন জীবিত প্রাণী দ্বারা নিয়ন্ত্রণকেই জৈব নিয়ন্ত্রণ বলে। বিড়াল, বন বিড়াল, শিয়াল, পেঁচা, গুইসাপ, অবিষধর সাপ, বেজি এসব প্রাণীর প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। এসকল প্রাণী সংরক্ষণ করে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
রাসায়নিক পদ্ধতি-
যে পদ্ধতিতে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে ইঁদুর ধ্বংস করা হয় তাকে রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা বলে। এ পদ্ধতিতে ইঁদুর দমনের জন্য দু’ধরণের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। একটি তীব্র বিষ অপরটি দীর্ঘস্থায়ী বিষ। তীব্র বিষ খাওয়ার সাথে সাথে ইঁদুর মারা যায়। তীব্র বিষ হচ্ছে – জিঙ্ক ফসফাইড। তীব্র বিষ ব্যবহারের কিছু কিছু অসুবিধা আছে তা হলো- জিঙ্ক ফসফাইড দিয়ে তৈরীকৃত বিষটোপ ইঁদুর পরিমিত মাত্রায় খাওয়ার আগে অল্প কিছুটা মুখে দিয়ে পরখ করে, তখন অসুস্থ হয়ে যায় কিন্তু মরে না। আবার পরিমিত মাত্রায় বিষটোপ খাওয়ার পর এক সাথে আনেকগুলো ইঁদুর মারা যেতে দেখে যেসব ইঁদুর বিষটোপ খায়নি তাদের বিষটোপ খাওয়ায় অনীহা লক্ষ করা যায়। একে ইঁদুরের বিষটোপ লাজুকতা বলো।
দীর্ঘস্থায়ী বিষ– দীর্ঘস্থায়ী বিষ খাওয়ার সাথে সাথে ইঁদুর মারা যায় না, ইঁদুর মারা যেতে ৫-১৩ দিন সময় লাগে। দীর্ঘস্থায়ী বিষ দিয়ে তৈরিকৃত বিষটোপ ইঁদুর খাওয়ার পর ইঁদুরের রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে যায়, ইঁদুরের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে ও আস্তে আস্তে দূর্বল হতে থাকে এবং ৫-১৩ দিনের মধ্যে ইঁদুর মারা যায়।
সাবধানতা– ইঁদুর মারার বিষ খুবই মারাত্নক। বিষ ব্যবহারের সময় পানাহার বা ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। কাজের শেষে হাত মুখ এবং শরীরের অনাবৃত অংশ ভালো ভবে ধুয়ে ফেলতে হবে। মানুষ বা পশু খাদ্যের সাথে ইঁদুরের বিষ পরিবহন বা গুদামজাত করা যাবে না। সন্ধায় দেয়া বিষটোপ কিছু থেকে গেলে সকালে উঠিয়ে রাখতে হবে। বিষটোপের খালি প্যাকেট অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। খালি প্যাকেট এবং মারা যাওয়া ইঁদুর মাটির বেশ নীচে নিরাপদ স্থানে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন কারনে মানুষ বিষাক্রান্ত হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে বমি করাতে হবে এবং খোলা জায়গায় শুইয়ে রাখতে হবে এবং সাথে সাথে ডাক্তার দেখাতে হবে।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আশ্বিন মাসে সারা দেশজুড়ে ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়। আমন ধান রক্ষাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতির মাত্রা কমানোর জন্য এ অভিযান চলে। এককভাবে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুর দমন করলে কোনো লাভ হবে না। ইঁদুর দমন কাজটি করতে হবে দেশের সব মানুষকে একসাথে মিলে এবং ইঁদুর দমনের সব পদ্ধতি ব্যবহার করে। আসুন সবাই একসাথে অতিচালাক ইঁদুরকে দমন করি।
- Advertisement -
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.